আজকের গল্প – ‘মেয়েটার ভাতকাপড় নয়, ওকে ভালো রাখার দায়িত্ব নাও’

গোলাপি ফ্রক পরা একটা মেয়ে অনেকক্ষণ ধরে ছুটোছুটি করছে এঘর থেকে ওঘরে, বকাঝকা করেও কোনোভাবেই সামলানো যাচ্ছে না তাকে। বিয়ের পিঁড়িতে বসে সেইদিকে তাকিয়েছিল দিঠি, কি দুরন্ত মেয়ে মাইরি! হঠাৎই কিছু একটা পায়ে বেঁধে দুম করে পড়ে গেল মেঝেয়, তারপর সে কি কান্না! পুরুতমশাইকে মন্ত্রোচ্চারণ বন্ধ করতে বলে বিয়ের পিঁড়ি থেকে উঠলো প্রিয়ম, এগিয়ে গেল বাচ্চাটার দিকে। তাকে কোলে তুলে নিয়ে চোখের জলটা মুছিয়ে দিতে দিতে বললো
ম্যাজিক দেখবে?
তুমি ম্যাজিক জানো?
হুম, জানি তো।
বলেই মেয়েটার পিছন থেকে হাত ঘুরিয়ে একটা ডেয়ারি মিল্ক এনে ওর হাতে দিয়ে বললো
এই নাও, এটা তোমার
ওয়াও! কিন্তু মাম বলেছে অচেনা কারোর থেকে কিছু নিতে না
― এটা খেলে মাম কিছু বলবে না…তুমি আরো ম্যাজিক দেখতে চাও তো?
ইয়াপ!
কিন্তু সেটা দেখার জন্য আমাকে একটা প্রমিস করতে হবে।
কি প্রমিস?
তুমি যদি তোমার মায়ের কোলে চুপটি করে বসে থাকো, তাহলে আমি আরো ম্যাজিক দেখাব। রাজি?
― রাজি!

বাচ্চাটাকে ওর মায়ের কাছে দিয়ে প্রিয়ম ফিরে এলো নিজের জায়গায়। দিঠি যত দেখছে এই মানুষটাকে ততই যেন অবাক হচ্ছে। এই যে বিয়েবাড়িতে এত লোক, বাচ্চাটাকে যে কেউ সামলাতেই পারতো কিন্তু প্রিয়ম আলাদা। আসলে আগলে রাখা যার প্রবৃত্তি, এড়িয়ে যাওয়া বোধহয় তার ধাতে নেই।
কি গো, কি দেখছ ওভাবে?
তোমাকে!
কেন? কি আছে এই পোড়া বদনে?
একলা রাতে মনখারাপের ওষুধ, দুঃখ শুষে নেওয়া ব্লটিং পেপার, অচেনা মানুষকে বিশ্বাসের হাত বাড়িয়ে দেওয়া বন্ধু…

************

ড: ভৌমিকের বাড়ি থেকে বেরোতেই কনকনে ঠান্ডা হাওয়া জ্যাকেটের ফাঁকফোকর দিয়ে ঢুকে ভেতরটা কাঁপিয়ে দিল প্রিয়মের। সামনে পৌষসংক্রান্তি, শীত আবার নিজের ছন্দে! সামনের মোড় থেকে বাস ধরবে ও, একটা চায়ের দোকান দেখতে পেয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো সেখানে, একটু গরম চা হলে মন্দ হয়না। নিয়নে মোড়া রাস্তায় যানবাহনের কলরব, সিগনালের সামনে সার বেঁধে দাঁড়িয়ে রয়েছে গাড়ি। প্রিয়ম ভাবে এই শহরে যত না মানুষ তার থেকেও বেশি হয়ে গেছে গাড়ি, ছোট ছোট বাক্সের মতো।

শহরের বুক চিরে বিষম প্রতিযোগিতা, একে অপরকে ঠেলে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা। ধোঁয়া ওঠা চা-টায় চুমুক দিতে দিতে পরবর্তী কাজগুলো মনে মনে গুছিয়ে নিচ্ছিল ও, এত তাড়াতাড়ি যে ডক্টরের appointment পেয়ে যাবে সেটা ও আন্দাজ করতে পারেনি, তাছাড়া ভদ্রলোক সজ্জন, ওদের এই ফাউন্ডেশনটার জন্য নিজে তো কিছু দেবেনই আর বেশ কিছু সোর্সেরও খবর দিলেন।

হঠাৎই চোখে পড়লো ঘটনাটা, চিন্তাভাবনার জটলাগুলো উবে গেল মাথা থেকে, একটা মেয়ে পায়ে পায়ে বড় রাস্তার ধার ধরে এগোতে এগোতে সিগনাল না মেনেই রাস্তা পার করতে শুরু করেছে, এইভাবে কেউ যায়? মারা পড়বে তো! চায়ের ভাঁড়টা বেঞ্চিতে রেখে চ্যাঁচাতে শুরু করলো ও, কিন্তু মেয়েটার কোনো হুঁশই নেই, কেমন যেন ভূতে পাওয়া মানুষের মতো এগিয়ে চলেছে। প্রিয়মের চিৎকার শুনে বাকিরাও চিৎকার শুরু করেছে, একটা ম্যাটাডোর ধেয়ে আসছে।

নিমেষে নিজের কর্তব্য স্থির করে দৌড় লাগালো ও…প্রায় নাগালের মধ্যে চলে এসেছে, আর দু-পা, গিয়ে মেয়েটার হাত ধরে হ্যাঁচকা টান, দুজনেই টাল সামলাতে না পেরে পড়ে গেল রাস্তায়, ইঞ্চিখানেক দূরে ব্রেক কষে দাঁড়িয়ে পড়েছে ম্যাটাডোরটা। ড্রাইভার জানলা দিয়ে গলা বের করে চেঁচাচ্ছে ” আরে মরার যখন এতই ইচ্ছে তো আমার গাড়ির সামনে কেন? শহরে কি জায়গার অভাব! যত্তসব ঝামেলা, আরেকটু হলেই কেলো হয়ে যেত পুরো…”

সার্জেন্ট ছুটে এসেছে, লোকও জড়ো হয়েছে চারদিকে। আশপাশের থেকে বিভিন্ন প্রশ্ন ধেয়ে আসছে, কেন এইভাবে রাস্তা পার করছিল? মাতাল নাকি? আত্মহত্যা করতে যাচ্ছিল না তো? প্রিয়মের হাতটা কনুইয়ের কাছে ছড়ে গেছে অল্প, গা ঝাড়তে ঝাড়তে উঠে বাকি লোকদের সরিয়ে দিয়ে মেয়েটাকে তুলে সামনের চায়ের দোকানটায় নিয়ে গেল ও
নিন, জলটা খান

আরে, ধরুন বোতলটা!…আপনি কি পাগল? কি করছিলেন এটা?
না, মানে…কেন বাঁচালেন আমাকে? নিজের করা ভুলগুলোর নিজের হাতে প্রায়শ্চিত্ত করতে চেয়েছিলাম
ম্যাডাম, মরার মধ্যে কোনো গর্ব নেই, বাঁচতে সাহস লাগে বুঝলেন?
বাঁচব! কার জন্য বাঁচব? যাকে বিশ্বাস করে নিজের সবটুকু দিয়েছিলাম, সেই যখন সবকিছু অস্বীকার করে পালিয়ে যায়…..
বাহ, অপরাধী নিজে ফেরার আর তার শাস্তি আপনি নিজেকে দিচ্ছেন? দেশে আইনকানুন নেই?
কি হবে ওসব করে? ওর শাস্তি হবে, জেল হবে কিংবা হয়তো বাধ্য হয়ে আমাকেই বিয়ে করবে…কিন্তু যে সম্পর্কে বিশ্বাস-ই থাকবে না, সেটাকে টিকিয়ে রেখে কি লাভ? তাই অসম্পূর্ণ সম্পর্কটায় ছেদ টানতে চেয়েছিলাম।
বাড়ি কোথায় আপনার? বাড়ির মানুষগুলোর অপেক্ষার দাম এইভাবে দেবেন?
বাড়ি ফেরার মুখ এমনিতেও নেই, মরে গেলে ওদের কষ্ট হতো ঠিকই কিন্তু মুখ পুড়তো না আর আমিও শান্তি পেতাম।
Stop talking nonsense...আর একটা কথাও বলবেন না, চুপচাপ চলুন আমার সঙ্গে।
কে আপনি? যেচে এত উপকার করছেন কেন আমার?
আমি? (কিছুক্ষণ থেমে) একলা রাতে মনখারাপের ওষুধ, দুঃখ শুষে নেওয়া ব্লটিং পেপার, অচেনা মানুষকে বিশ্বাসের হাত বাড়িয়ে দেওয়া বন্ধু…..ভরসা করে দেখতেই পারেন, কোনো ক্ষতি করব না।
প্রিয়মের কথায় এমন কিছু ছিল যে চুপ করে গেল মেয়েটা। চায়ের দোকান থেকে বেরিয়ে পাশাপাশি হাঁটতে থাকলো দুজনে। একটা ট্যাক্সি ডেকে, ওতে উঠে ড্রাইভারকে গন্তব্য বলে দুজনে বসলো দুই ধারে।
এই নিন চকলেট, খান
এটা কি সকলের কাছে সাধু সেজে এখন আমাকে অজ্ঞান করে অন্য কিছু করার প্ল্যান?
আপনি যা মনে করবেন
ভালোমানুষির মুখোশের আড়ালেও মাঝেমধ্যে একটা হিংস্র দাঁত, নখ লুকিয়ে থাকে, সেটার প্রমাণ আমি নিজের জীবন দিয়েই পেয়েছি

সব ছেলে সমান হয় না! বিশ্বাস অবিশ্বাস সম্পূর্ণ আপনার ওপর…
চকলেটটা মুখে পুরে জানলার দিকে মুখ ফেরালো মেয়েটা। কিছুক্ষণ কোনপ্রান্তেই কথা নেই কোনো। নীরবতা ভেঙে ও-ই বললো
আপনি কি সবসময় চকলেট নিয়ে ঘোরেন?
হ্যাঁ, আপনার মতো জেদি, অবুঝ বাচ্চাকে বাগে আনতে যে এটাই মোক্ষম অস্ত্র।
কথাটা শুনে রাগবে না হাসবে সেটাই ঠিক করতে পারলো না ও। নাহ, এই মানুষটাকে আর যাই হোক অবিশ্বাস করা যায় না। অনেকক্ষণ পর মন খুলে হাসলো ও, একটা পাথর সরে গেল বুকের ওপর থেকে। ওর মুখের দিকে এক পলক তাকিয়ে প্রিয়মের ঠোঁটের কোণেও হাসি ফুটলো, দমচাপা কালো মেঘ সরছে আস্তে আস্তে কিন্তু পাশাপাশি একটা সিঁদুরে মেঘেরও আনাগোনা শুরু হলো ভেতরে ভেতরে। এ কিসের ইঙ্গিত?

মেয়েটার বাড়ির কাছে গাড়ি আসতেই নিজেই ড্রাইভারকে দাঁড়াতে বললো সেখানে। ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে পার্সটা বের করে জিজ্ঞেস করলো
কত হয়েছে দাদা?
আপনি যান, ভাড়াটা আমিই দিয়ে দেব।
এমনিই কিন্তু আমি আপনার কাছে ঋণী, এই ঋণ আদৌ শোধ হবে?
একদিন নাহয় আমি নিজেই পুষিয়ে নেব।
কিভাবে?
ক্রমশ প্রকাশ্য…আচ্ছা, আপনার নামটা?
দিঠি…দিঠি সেন। আপনার?
প্রিয়ম ঘোষ…আর এই ‘আপনি আজ্ঞে’ বন্ধ করলে ভালো হয়, বড্ড বুড়ো বুড়ো লাগে নিজেকে!
যথা আজ্ঞা। বন্ধু যখন বললেন তুই-ই সই!

কয়েক সপ্তাহে প্রিয়মের সাথে ভালোই বন্ধুত্ব হয়ে গেছে দিঠির, হোয়াটসঅ্যাপে কথাবার্তা হয় দুজনের। সত্যি বলতে প্রিয়মের ভালো লেগে গেছে দিঠিকে, চোখ বুজলেই খালি ভেসে ওঠে ওই মায়াভরা মুখ, ঠোঁটের কোণে তিল। কথাবার্তা ‘তুই’ থেকে ‘তুমি’তে এসে ঠেকেছে। এদিকে দিঠিও আস্তে আস্তে দুর্বল হয়ে পড়ছে প্রিয়মের প্রতি, ওর এই আগলে রাখা, রাগ ভাঙানো, প্রাণখোলা হাসি বড্ড টানছে ওকে। প্রিয়মের কাছ থেকেই ও আবার শিখেছে বাঁচার মানে। কিন্তু কিছু সম্পর্ক বোধহয় বন্ধুত্বের বেশি এগোয় না, এগোনোর সাহস দেখাতে নেই, ওর এই ভুলের মাশুল অন্য কেউ কেন গুনবে?

দিঠি তাই মনে মনে ঠিক করে নিয়েছিল কি করবে, সিঙ্গেল মাদার হয়ে দেখিয়ে দেবে কিভাবে একাই বাবা-মায়ের দ্বৈতভূমিকা সামলানো যায়। তাছাড়া অবিবাহিতা গর্ভবতী মেয়ে আবার নতুন সম্পর্কে জড়িয়েছে- পাড়া প্রতিবেশীর এই রসালো, মুখরোচক খবরগুলো যখন কানে আসে নিজের ওপরই কেমন যেন ঘেন্না হয় দিঠির; কিছু ভুলের প্রায়শ্চিত্ত আজীবন করে যেতে হয়। ওর জন্য প্রিয়মকে যাতে কোনোদিনও অপমানিত হতে না হয় তাই প্রিয়মের ওর প্রতি সফট কর্নার আছে জেনেও নিজে কিছুটা এড়িয়ে চলে ওকে।

একদিন হঠাৎই দুপুরে প্রিয়মের ফোন পেয়ে অবাক হয় ও, এই সময়তো কাজ নিয়েই থাকে ছেলেটা, তাহলে ফোন করছে কেন? কিছু বিপদ হলো নাকি!
হ্যালো, একবার বিকেলে আসতে পারবে?
কোথায়?
ধরে নাও বাঁচার মানে খুঁজতে!
মানে? হেঁয়ালি না করে স্পষ্ট করে বলো তো! তুমি তো জানোই তোমার আমার মেলামেশাটা পাড়াপ্রতিবেশীরা ভালো চোখে দেখে না।
সেদিনকার ঋণ চোকানোর জন্য ডাকছি, আসবে না?

সেদিন প্রিয়ম দিঠিকে নিয়ে গেছিল একটা হোমে। ডাউন সিনড্রোমে আক্রান্ত বাচ্চাগুলোর সঙ্গে ওরা অনেকটা সময় কাটিয়েছিল একসাথে। ফেরার সময় প্রিয়ম বলেছিল,
আমরা পারি না দুজনে মিলে এদেরকে সমাজের মূল স্রোতে ফিরিয়ে দিতে?
বন্ধু হিসেবে আমি সবসময় তোমার পাশে আছি।
না, শুধু বন্ধু হিসেবে নয়, সহধর্মিণী হিসেবে যদি পাশে চাই, থাকবে না?
আমাকে ওই জীবনের লোভ দেখিও না প্রিয়ম, যেটা অসম্ভব সেটা কল্পনাও করতে নেই
আমি যদি সম্ভব করে তুলি?
সমাজের কাছে উত্তর দিতে দিতে ক্লান্ত হয়ে যাবে যে, তখন?…
দিনশেষের নিশ্চিন্ত আশ্রয় তো তুমি, তোমার কোলে মাথা দিয়ে রাতের আকাশে তারা গুনব। আমার একলা রাতের তারাগোনার সাথী হবে না তুমি?

উত্তর আসেনি কিছু; নীরব ঠোঁট, অশ্রুসিক্ত চোখদুটোই বলে দিয়েছিল সবকিছু।

************

বৌভাতের দিন দুপুরে ভাত কাপড়ের অনুষ্ঠানে প্রিয়ম দিঠির হাতে ভাত-কাপড়ের থালাটা দিয়ে বললো
আজ থেকে তোমার ভরণপোষণের পাশাপাশি সুখ-দুঃখের ভাগীদার হলাম আমি
আমিও আজ থেকে তোমার সঙ্গে তোমার আশ্রমের সমস্ত বাচ্চাকে একসাথে সুস্থ করার লড়াইয়ে সামিল হলাম।
উপস্থিত সবাই হাততালি দিয়ে উঠলো, আশ্রমের বাচ্চাগুলো ঘিরে দাঁড়িয়ে রয়েছে ওদের। প্রিয়মের মা দিঠির কপালে স্নেহের পরশ এঁকে জড়িয়ে ধরলো দুজনকে। এভাবেই একসাথে হেঁটে চলুক ওরা নিজেদের জীবনে, ভালোবাসা দিয়ে গড়ে তুলুক ভালো বাসা।

“যদি পাশে থাকো, হাতে হাত রাখো
সব পাবো ভরসা দিলে,
থেকে যাব তোমায় আমায় মিলে।”

কলমে: সায়ন্তন মজুমদার
চিত্রঋণ : সংগৃহিত

Back to top button