‘শরীর ভালো নেই!’ মৃত্যুর আগে হাওড়ার এই বাড়িতে গিয়ে নিজের অসুস্থতার কথা বলেছিলেন উত্তম কুমার

নিজস্ব প্রতিবেদন: আজকের এই বিশেষ প্রতিবেদনে আমরা আপনাদের সঙ্গে শেয়ার করে নেব মৃত্যুর মাত্র কয়েকদিন আগে হাওড়ার জগৎবল্লভপুর এর প্রত্যন্ত গ্রামের বাড়িতে এসে কি বলেছিলেন উত্তম কুমার! হয়তো আপনারা অনেকেই ভাবছেন কি এমন রয়েছে এই গ্রামের বাড়িতে। প্রসঙ্গত হাওড়া জগৎবল্লভপুর এর প্রত্যন্ত গ্রামের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক ছিল কলকাতার টলি পাড়ার। ষাটের দশকের শুরু থেকে প্রায় তিন দশক বাংলা সিনেমা আলোড়ন সৃষ্টি করে চন্ডীমাতা ফিল্মস।

সে সময় বাংলা সিনেমার জগতের সমস্ত অভিনেতা অভিনেত্রীরা এসে থাকতেন এই গ্রামের বাড়িতে। ওই বাড়ির তিন তলার দক্ষিণ দিকের বারান্দাযুক্ত ঘরটিতে থাকতেন মহানায়ক উত্তম কুমার। বাড়ির ওই ঘরটি কিন্তু আজও উত্তম কুমারের ঘর হিসেবে এই পরিচিত। অবসর সময়ে কিংবা মন ভারাক্রান্ত থাকলে তিনি সেখানে চলে যেতেন। উত্তম কুমারের বায়োগ্রাফি ‘আমার আমি’ বইতে এই ঘরের কথা বেশ কয়েকবার উল্লেখ করেছেন তিনি। শেষবারের মতন এই বাড়িতে তিনি এসেছিলেন মৃত্যুর কয়েক দিন আগে।

তখনই স্থানীয় আনন্দ বাবু জানান উত্তম কুমারের সঙ্গে কথার পর তিনি জানতে পেরেছিলেন তখন তার মন ভালো ছিল না।। সত্যি কথা বলতে শহরে মনকে আকৃষ্ট করার মতোই ছিল জগৎবল্লভপুর গ্রাম। গ্ৰামের মাঝখান দিয়ে বয়ে গেছে দামোদর। নদী সংলগ্ন সবুজ ধানের ক্ষেত কাঁচা মাটির রাস্তা এক অপরূপ দৃশ্য। গ্রাম এবং গ্রামের মানুষদের সঙ্গে কলকাতার সেসময় শিল্পীদের এক আত্মিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল বলা যায়।। জগৎবল্লভপুরের প্রাণপুরুষ ছিলেন রূপকার সত্যনারায়ণ খাঁ। সত্যনারায়ণ বাবু সেই সময়ে একজন নামজাদা ব্যবসায়ী ছিলেন। পরবর্তী সময় তিনি বাংলা সিনেমা জগতের সঙ্গে যুক্ত হন এবং নিজের হাতে গড়ে তোলেন চন্ডীমাতা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি।

সিনেমার শুটিংয়ের কাজে সুদূর কলকাতা থেকে প্রায় অধিকাংশ তারকারাই সত্যনারায়ণ বাবুর গ্রামে শুটিং এর জন্য এসে তার বাড়িতে রাত কাটিয়ে গিয়েছেন। দূরদূরান্ত থেকে বহু মানুষ কিন্তু এখানে শুটিং পর্যন্ত দেখতে আসতো। যার ফলস্বরূপ গ্রামে শুটিং চলাকালীন এটি এক প্রকার মেলার মতন হয়ে যেত। সত্যনারায়ণ বাবুর বাড়ির পাশেই থাকতেন তার গাড়ির চালক ভরত দাস। তিনিই মহানায়ক উত্তম কুমার থেকে শুরু করে সুচিত্রা সেনদের মতন ব্যক্তিত্বদের নিয়ে বাড়িতে আসা-যাওয়া করতেন।

সত্যনারায়ণ বাবুর বাড়ি অর্থাৎ চন্ডীমাতা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির বিশাল বাড়িতে এখন আর কোন অভিনেতারা আসেন না বটে তবে বাড়িটি দেখতে কিন্তু বহু দূর দূরান্ত থেকে মানুষ আসেন এই গ্রামে। সেই সময় সত্যনারায়ণ বাবুর ব্যক্তিগত সখ্যতা ছিল উত্তম কুমারের সঙ্গে। চন্ডীমাতা ফিল্মস এর বহু সিনেমাতে কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন মহানায়ক উত্তম কুমার। সেইসব ছবির অনেক দৃশ্যের শুটিং হয়েছিল জগৎবল্লভপুরের গোহালপোতা গ্রামে। স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গিয়েছে উত্তম কুমারের থাকার জন্য গ্রামে বিলাসবহুল বাড়ি তৈরি করেছিলেন সত্যনারায়ণ বাবু।

তিনতলা সেই বাড়িতে রীতিমতো যে কোন প্রথম শ্রেণীর হোটেলের মতন সুবিধা পাওয়া যেত। সত্যনারায়ণ বাবুর পুত্রবধূ মৃদুলা খাঁ জানিয়েছেন,”উত্তম কুমার টানা ৩০ বছর আমাদের বাড়িতে এসেছেন। শেষবার এসেছিলেন ১৯৮০ সালে প্রতিশোধ ছবির শুটিং করতে। আমি বিভিন্ন সময় তার জন্য শরবত করে নিয়ে গিয়েছি। তবে তিনি বেশিরভাগ সময়টাই অভিনয়ের চিন্তায় বুদ হয়ে থাকতেন। উঠলে মনে হতো হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে উঠলেন”।

তবে শেষবার যখন তিনি এই বাড়িতে আসেন অর্থাৎ মৃত্যুর ঠিক আগে সেবার তার মন অনেকটাই ভারাক্রান্ত ছিল। প্রধানত অসুস্থ থাকার কারণে সুপ্রিয়া দেবীর তার জীবনে অনুপস্থিতি এবং আরো নানান ধরনের টানাপোড়েনের মধ্যে ছিলেন মহানায়ক। তবে হয়তো তিনিও জানতেন না আর কখনো তিনি তার এই প্রিয় গ্রামের বাড়িতে যেতে পারবেন না। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য মাত্র ৫৩ বছর বয়সের হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ২৪ শে জুলাই ১৯৮০ সালে ওগো বধূ সুন্দরী ছবির শুটিং শেষের ঠিক পরবর্তী দিন কলকাতার এক বেসরকারি হাসপাতালে মারা যান মহানায়ক উত্তম কুমার। তার মৃত্যু ছিল চলচ্চিত্র জগতের সবথেকে বড় নক্ষত্রপতন।

Back to top button