স্ত্রী গৌরী দেবীর মুখের আদলে লক্ষ্মী প্রতিমা গড়ে করতেন পুজো, জানেন মহানায়কের এমন সিদ্ধান্তের কারণ কি?

নিজস্ব প্রতিবেদন: সম্প্রতি কয়েকদিন আগেই পেরিয়ে গিয়েছে কোজাগরী লক্ষ্মীপূজো। নিয়ম মেনে সাধারন মানুষ থেকে শুরু করে সেলিব্রিটিদের সকলের বাড়িতেই কিন্তু ধন-সম্পদের দেবী লক্ষ্মীর আরাধনা করা হয় এদিন। লক্ষ্মী পুজোর সাবেকিয়ানার কথা বলতে গেলে আমরা বলতে পারি মহানায়কের বাড়ির পুজোর কথা। বাংলা সিনেমার স্বর্ণযুগ মানেই মহানায়ক উত্তম কুমারের ভুবন ভুলানো অভিনয়। উত্তম কুমারের হাসি কিন্তু সর্বদাই মুগ্ধ করেছে কোটি কোটি ভক্তদের।

তার মৃত্যুর পর এতগুলি বছর অতিক্রান্ত হলেও মহানায়ক কে নিয়ে বাঙালির মনে কৌতূহলের অন্ত নেই। ১৯৫০ সালে ছেলে গৌতমের জন্মের পর ভবানীপুরের গিরিশ মুখার্জী রোডে চট্টোপাধ্যায় বাড়িতে কোজাগরি লক্ষ্মী পূজো শুরু করা হয়।  ছবি বিশ্বাসের বাড়ির কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো দেখেই উত্তম কুমারের ইচ্ছে হয়েছিল নিজের বাড়িতে লক্ষ্মী দেবীর আরাধনা করার।

মহানায়কের মৃত্যুর পর একচল্লিশ বছর পার হয়ে গেলেও পুজোর ঐতিহ্য একই রকম ভাবে বজায় রেখেছেন চট্টোপাধ্যায় পরিবারের নতুন প্রজন্ম। বর্তমানে উত্তম কুমারের নাতি গৌরব এবং নাতনী নবনীতা পূজোর সকল দায়িত্ব পালন করেন। সাধারণত চেনা ছাঁচে যে সমস্ত লক্ষ্মী প্রতিভার মুখ তৈরি করা হয়ে থাকে উত্তম কুমারের বাড়ীর প্রতিমার ক্ষেত্রে কিন্তু সাধারণত তেমনটা ঘটে না।

আসলে উত্তম কুমারের স্ত্রী গৌরী দেবীর মুখের আদলে লক্ষ্মী প্রতিমার মুখাবয়ব তৈরি করা হয় এই বাড়িতে। শোনা যায় যদুভট্ট ছবির শুটিংয়ের জন্য সরস্বতী প্রতিমা তৈরি করেছিলেন শিল্পী নিরঞ্জন পাল। এই মূর্তি মহানায়ক উত্তম কুমারের অত্যন্ত পছন্দ হয়েছিল। পরে তিনি নিরঞ্জন পালকেই নিজের বাড়ির লক্ষ্মী প্রতিমা তৈরি করার জন্য বায়না দেন। এই সময় শিল্পী নিরঞ্জন পাল উত্তম কুমারের খোঁজ করতে তার ভবানীপুরের বাড়িতে গিয়েছিলেন।

তখন মহানায়কের স্ত্রী ঘর মুছছিলেন। ঘোমটার ফাঁক থেকে এক ঝলক তাকিয়ে শিল্পীকে বসতে বলেন গৌরী দেবী। কিন্তু গৌরী দেবীকে দেখার সাথে সাথেই নিরঞ্জন পালের চোখে লক্ষ্মী প্রতিমার ছবি আঁকা হয়ে যায়।। পরবর্তী সময়ে মহানায়কের সম্মতি নিয়ে গৌরী দেবীর অবয়বে লক্ষ্মী প্রতিমা নির্মাণ করেন নিরঞ্জন পাল। আজও প্রতিমার মুখের গড়নে রয়েছে সেই চেনা ছাপ।

গৌরী দেবীর মৃত্যুর পর পুত্র গৌতম একবার কুমোরটুলিতে প্রতিমা দেখতে এসে রীতিমতো হতচকিত হয়ে পড়েছিলেন। তিনি যেন তখন তার সাক্ষাৎ জন্মদাত্রী মায়ের মুখোমুখি হয়েছিলেন। এতটাই জীবন্ত ছিল শিল্পীর শিল্প সত্তা। কেবল উত্তম কুমারই নন প্রতিমা শিল্পীর কারণেই চলে এসেছে এই ট্র্যাডিশন। এই বাড়ির পুজোয় মা লক্ষ্মী সাজেন সোনার গয়না আর বেনারসি শাড়িতে। প্রথমে শিল্পী নিরঞ্জন পাল এই দায়িত্ব পালন করতেন।

তবে বিগত কুড়ি বছর ধরে এই দায়িত্ব পালন করেন মেকআপ শিল্পী শেখর অধিকারী। লক্ষ্মী পূজার আগের দিন রাতে চট্টোপাধ্যায় বাড়ির সদস্যরা কুমোরটুলি থেকে প্রতিমা নিয়ে আসেন।। এইসময় প্রতিমার পরনে থাকে লাল পাড় সাদা শাড়ি। প্রথম দিকে উত্তমকুমার এবং গৌরী দেবী এই পুজোয় বসতেন। বর্তমানে নাতি গৌরব চট্টোপাধ্যায় এই পুজোয় বসেন। সেই সময় পুজো চলাকালীন উত্তম কুমারের সহ অভিনেতা আর অভিনেত্রীদের মধ্যে প্রায় প্রত্যেকেই তার বাড়িতে লক্ষ্মীপূজায় উপস্থিত হতেন।

খাওয়া,আড্ডা থেকে শুরু করে গান বাজনার মধ্যেই কেটে যেত পুজোর দিন। উত্তম কুমার নিজে দাঁড়িয়ে থেকে সমস্ত অতিথিদের খাবার পরিবেশন করতেন। সকলের খাওয়া হলে তিনি নিজে খেতে বসতেন। পুজোর পরের দিন দরিদ্র নারায়ণ সেবা করতেন মহানায়ক। সকলের পাতে নিজেই খাবার পরিবেশন করতেন তিনি। মহানায়কের বাড়ির লক্ষ্মী পুজোতে ঢাক বাজানোর রীতি রয়েছে। শোভাযাত্রা সহকারে প্রতিমা বিসর্জনের যে ধারা বজায় ছিল, তা কিন্তু আজও অমলিন।

মহানায়ক একবার পুজোর শেষে সিঁড়ি দিয়ে দোতলার ঘরে যাওয়ার সময়, হঠাৎই বাইরে বেরিয়ে যান এবং বাইরে ঢোকার দরজা দিয়ে ভেতরে আসার সময় মাটি ছুঁয়ে প্রণাম করেন। এই প্রসঙ্গে তাকে তখন জিজ্ঞেস করা হয়েছিল তখন তিনি বলেছিলেন, “বাড়িতে এত মানুষ এসেছিল। তোমরা কি জানো তার মধ্যেই হয়তো দেবী এসেছিলেন!”এই কথার মধ্যে দিয়ে উত্তম কুমারের ভক্তি আর নিষ্ঠা সত্তাকে সহজেই উপলব্ধি করতে পারবেন আপনারা। আজকের এই বিশেষ প্রতিবেদনটি ভালো লেগে থাকলে অবশ্যই আপনারা তা শেয়ার করে নিতে পারেন।

Back to top button