একসময় হয়েছিলেন চরম অপমানিত! শেষসময় কেটেছিল প্রচণ্ড দারিদ্রতায়, বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্রের অজানা কাহিনী চোখে আনবে জল

নিজস্ব প্রতিবেদন: কায়স্থের ছেলে মহালয়ার অনুষ্ঠানে মন্ত্র পড়বেন- উচ্চবর্ণের হিন্দুদের অনেকেই সেটা মানতে পারেননি। কিন্ত রেডিওতে মহিষাসুরমর্দিনীর সম্প্রচার হবার সাথে সাথে সব বদলে গেল, সেই অনুষ্ঠান এমনই জনপ্রিয়তা পেল যে, একটা সময় বাঙালী তার মহানায়ককেও ছুঁড়ে ফেলেছিল অবলীলায়। শিরোনাম দেখে নিশ্চয়ই আপনারা বুঝে গিয়েছেন আমরা কার কথা বলছি। আমরা বলছি বাঙালির অতিপ্রিয় বাঙালির আবেগ বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্রের কথা।

সালটা হয়তো অনেকেরই মাথায় নেই। আকাশবাণী কলকাতার অফিসে হিন্দু সমাজের নেতারা হাজির হয়েছেন, পঙ্কজ মল্লিকের সঙ্গে দেখা করবেন, বিরাট অভিযোগ নিয়ে এসেছেন তারা। অফিসের আনাচেকানাচে ফিসফাস চলছে। পঙ্কজবাবু তখন রেকর্ডিং রুমে, সেখান থেকে ডেকে আনা হলো তাকে। অভিযোগ পেশ করা হলো- কায়স্থের ছেলেকে দিয়ে চণ্ডিপাঠের আসর বন্ধ করতে হবে। এতে নাকি দেবীর অপমান, হিন্দু ধর্মের অপমান হয়।

নেতাদের দাবী একটাই, বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রকে বাদ দিয়ে ব্রাহ্মণ কারো গলায় মন্ত্রোচ্চারণ করানো হোক। তাহলেই আর কোন ঝামেলা থাকবে না। কিন্তু পঙ্কজ বাবু কঠিন মানুষ। নেতাদের কথা শুনে রীতিমত বেঁকে বসলেন তিনি।হিন্দু সমাজের নেতাদের পাল্টা হুমকি দিলেন তিনি, মহালয়ার অনুষ্ঠানে মন্ত্রপাঠ যদি কেউ করে থাকে, সেটা বীরেনই করবে।

সেইসঙ্গে এটাও বলে দিলেন- “আমাকে বাদ দিয়ে মহালয়া হলেও হতে পারে, কিন্ত বীরেনকে বাদ দিয়ে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ চালানো অসম্ভব!” পঙ্কজ মল্লিক সেদিন হয়তো জানতেন না, উত্তেজনার বশে বলে ফেলা তার এই কথাটা পশ্চিমবঙ্গের মানুষ প্রমাণ করে দেবে সাড়ে চার দশক পরে, বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের সামনে ম্লান হয়ে যাবেন বাঙালির ইতিহাসের সবচেয়ে বর্ণময় এবং জনপ্রিয় চরিত্রগুলোর একটি- উত্তম কুমারও!

চলে আসি ১৯৩১ সালে।সেবছর অন্নপূর্ণা আর বাসন্তী পুজো একেবারে গায়ে গায়ে পড়েছিল।এই দুই পুজোর মাঝখানে রেডিওতে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। নাম দেওয়া হয় ‘দেবী বসন্তেশ্বরী’। অনুষ্ঠানটির নেতৃত্বে ছিলেন পঙ্কজ কুমার মল্লিক, বৈদ্যনাথ ভট্টাচার্য, বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্র, হরিশচন্দ্র বালি- এরা সবাই। সম্প্রচারের পর অসম্ভব জনপ্রিয়তা পেল অনুষ্ঠানটি। বাঙালির মনে এতটাই জায়গা করে নেয় এই অনুষ্ঠান যে, উৎসাহিত হয়ে আকাশবাণী কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললো, পরের বছরেই এটি চণ্ডীপাঠ হিসাবে অনুষ্ঠিত হবে।

পরের বছর প্রস্তুতি স্বরূপ অনেক আগে থেকেই কিন্তু রিহার্সাল শুরু হয়ে গিয়েছিল।হিন্দু সমাজের বিরোধের ঘটনাটা তখনকার। রেডিওতে টুকটাক নাটক করা বীরেন্দ্র ভদ্র জাতে ব্রাহ্মণ ছিলেন না, রেডিওরই কেউ হয়তো সেটা  প্রচার  করেছিল হিন্দু সমাজের নেতাদের কাছে। আর সেখানেই ঘটে চরম বিপত্তি।১৯৩২, মহালয়ার দিন ভোররাত, আঁধারের চাদর তখনও সরেনি, শহর কলকাতায় শীতের আমেজ চলে এসেছে অবশ্য। এমনই সময়ে রেডিওতে শোনা গেল বীরেন ভদ্রের গমগমে গলা, ভেসে এলো গুচ্ছ গুচ্ছ কিছু শব্দ- ‘আশ্বিনের শারদপ্রাতে বেজে উঠেছে আলোকমঞ্জীর…’

বেলা গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সবার মুখে একটাই প্রশ্ন, অমন হৃদয় নিংড়ানো আওয়াজে চণ্ডীপাঠ করলেন কে? কেউ ভুলেও জানতে চাননি, যিনি মন্ত্রোচ্চারণ করলেন, তিনি ব্রাহ্মণ সন্তান নাকি কায়েতের ছেলে!এক ধারায় সাড়ে চারটে দশক কেটে গেল।পালাবদলের হাওয়া লাগলো ১৯৭৬ সালে। ইমার্জেন্সি চলছে তখন গোটা ভারতজুড়ে। দিল্লিতে বসে আকাশবাণীর কর্তারা ঠিক করলেন, মহিষাসুরমর্দিনীর সম্প্রচার বন্ধ করে দেয়া হবে। তার পরিবর্তে মহালয়ায় হবে নতুন অনুষ্ঠান, নতুন সঙ্গীতায়োজনে, স্টার কোন ভয়েস নিয়ে।

বাঙালীর কাছে তখন সবচেয়ে বড় স্টার উত্তম কুমার, তাকে রাজী করানো হলো। কিন্তু প্রথমে রাজি হন নি মহানায়ক। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কাছ থেকে অনুমতি আর সাহস নিয়ে শেষমেশ রাজি হলেন তিনি।ফলাও করে প্রচার চালানো হলো, মহালয়ার সকালে নতুন অনুষ্ঠান আসছে, উত্তম কুমার কণ্ঠ দেবেন তাতে, অনুষ্ঠানের নাম ‘দেবী দূর্গতিহারিনী’। সবার মধ্যে একটা আগ্রহও তৈরী হলো। উনিশশো ছিয়াত্তরের মহালয়ার সকালে বাঙালির ঘুম ভাঙলো মহানায়কের কণ্ঠে মন্ত্রপাঠ শুনে। কিন্তু তারপর যে ঘটনাটা ঘটেছিল সেটা হয়তো মহানায়ক বা আকাশবাণী কর্তৃপক্ষ স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারেনি।

আকাশবাণীর অফিসে চিঠির মেলা বসলো, শত শত লোক গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে গালাগাল দিতে থাকলো আকাশবাণীর কর্তৃপক্ষকে। অবস্থা বেগতিক দেখে তারা আগের রেকর্ড করা বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠে মহালয়া চালাতে বাধ্য হলো আবার। সত্যি বলতে উত্তম কুমার কিন্তু খারাপ পারফরম্যান্স দেননি।সমস্যাটা হচ্ছে, দিল্লিতে বসে থাকা আকাশবাণীর কর্তারা বাঙালি সেন্টিমেন্টটা ধরতে পারেননি, বুঝতেও পারেননি। সব নতুন যে সবাই মেনে নিতে পারবে না, সেটা তাদের কল্পনায় ছিল না।

বাঙালি মহানায়কের কন্ঠে চন্ডী পাঠ শুনলেও তার মধ্যে কিন্তু কোন পুজোর আমেজ খুঁজে পায়নি।১৯৭৬ সালে আকাশবাণী যখন এত আয়োজন করছে মহালয়াকে নতুন করে ঢেলে সাজানোর জন্য, তখন তাদের কেউ বীরেন্দ্রবাবুকে জানায়ওনি কিছু। অথচ লোকটা নিজের গোটা জীবনটা বেতারকে দিয়েছেন, কী না করেছেন তিনি রেডিও’র জন্য? সংসারের দিকে তাকাননি, স্ত্রীকে সময় দেননি, ছেলে-মেয়ের বিয়ের অনুষ্ঠান বাদ দিয়ে রেকর্ডিংয়ে ব্যস্ত থেকেছেন, বিনিময়ে পেলেন একরাশ অবহেলা। এইসময় কিন্তু বীরেন্দ্র বাবুকে অত্যন্ত আক্ষেপ প্রকাশ করতেও দেখা গিয়েছিল। তার সেই কথা শুনে বোঝাই যায় অত্যন্ত দুঃখ পেয়েছিলেন তিনি।আক্ষেপ করে বলেছিলেন- “ওরা একবার আমায় জানালোও না। আমি কি নতুন কিছুকে কোনও দিন বাধা দিয়েছি?”

সত্যি বলতে দুঃখের বিষয় এটাই আজ এত বছর পরেও,আকাশবাণীকে যিনি বাঙালীর কাছে এত জনপ্রিয় করে তুলেছেন, তাকে প্রাপ্য মর্যাদাটা আকাশবাণী কখনোই দিতে পারেনি। স্টাফ আর্টিস্ট হয়েই অবসর নিয়েছিলেন বীরেনবাবু। পেনশন জোটেনি। আসলে আখের গোছানোর কথা কখনও ভাবার সময় পাননি তিনি। অবসরের পরে, ‘মহাভারতের কথা’ বলার জন্য কটা টাকা পেতেন। ক্রমশ স্মৃতিভ্রংশ হয়ে আসছিল।অর্থাভাব মেটাতে পাড়ায় পাড়ায় অনুষ্ঠান উদ্বোধন করে বেড়াতে লাগলেন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। সেখান থেকেও যে বেশি কিছু পেতেন, তাও নয়। শেষ জীবনে এমন অবস্থা হয়ে গিয়েছিল যে তার ঠিক মতন সংসারও চলত না।

অত্যন্ত অভিমানী ছিলেন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র।অবসর নেওয়ার পর আকাশবাণীতে একটা কাজে এসেছিলেন, ঢুকতে গিয়ে বাধা পেলেন। একজন সিকিউরিটি গার্ড বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কাছে ‘পাস’ চেয়ে বসল। সেদিন মাথায় রক্ত উঠে গিয়েছিল তার, চেঁচিয়ে লোক জড়ো করে ফেলেছিলেন, থরথর করে কাঁপছিলেন, ফর্সা চেহারায় শিরাগুলো দপদপ করছিল। আসলে যতই যাই সহ্য করুন না কেন নিজের অপমান কোনো শিল্পীই কিন্তু সহ্য করতে পারে না। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। শেষ জীবনটা অত্যন্ত কষ্টের মধ্যে কাটিয়েছেন এই প্রবাদপ্রতিম শিল্পী।অভাব তো সঙ্গী ছিলই, সেইসঙ্গে শরীরে বাসা বেঁধেছিল আলঝেইমার, কিছুই মনে রাখতে পারতেন না।

১৯৯১ সালের ৪ঠা নভেম্বর অনন্তলোকের পথে যাত্রা করলেন তিনি, পেছনে রেখে গেলেন কর্মময় এক জীবন। সবশেষে পাঠকদের উদ্দেশ্যে জানিয়ে রাখি,বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের ওই মহিষাসুরমর্দিনী রেডিওর ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি সময় ধরে চলা অনুষ্ঠান হিসেবে অনেক আগেই রেকর্ড করে ফেলেছে। তবুও শেষ বয়সের অনেক সাক্ষাৎকারেই বারবার ঠিকরে বেরিয়েছে বীরেন্দ্রকৃষ্ণের হতাশা আর অভিমান, বলতেন- ‘‘ভাবতেই পারিনি সবাই আমাকে ভুলে যাবে…’’ তবে নিজেই আবার বলে গিয়েছেন, ‘‘আমাকে ভুলে গেলেও বছরে একবার সেই দিনটিতে স্মরণ করবেই করবে। তাতেই আমার তৃপ্তি।’’

Back to top button