আপনার শিশু কৃমির সমস্যায় ভুগছে? কীভাবে বুঝবেন? কী কী প্রতিকার ব্যবহার করবেন?

নিজস্ব প্রতিবেদন: কৃমি এমন একটি সমস্যা যা শিশু থেকে বয়স্ক সকলের মধ্যেই কম বেশি দেখা যায়। তবে নানান ধরনের কারণের জন্য বাচ্চাদের মধ্যে কিন্তু কৃমির সমস্যা সব থেকে বেশি। আজকের এই বিশেষ প্রতিবেদনে আমরা আলোচনা করব কিভাবে আপনারা শিশুদের কৃমির সমস্যা থেকে দূরে রাখতে পারেন।

তবে প্রতিবেদনটি বিস্তারিত শুরু করার আগে আপনাদের জেনে নিতে হবে এই কৃমি আসলে কি? কৃমি হচ্ছে একরকমের পরজীবী প্রাণী, যা মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর দেহে বাস করে সেখান থেকে খাবার গ্রহণ করে বেঁচে থাকে।কৃমির সমস্যা বাড়লে শরীরে রক্তাল্পতা এবং আয়রন ডেফিশিয়েন্সির আশঙ্কা অনেকটাই বেড়ে যায়।

কৃমি থাকলে শরীরে রক্তের পরিমাণ কমতে কমতে অ্যানিমিয়া পর্যন্ত হতে পারে।শিশু অমনোযোগী হয়ে পড়তে পারে। কৃমির সমস্যা থাকলে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে শিশুর বাড়-বৃদ্ধিও।একাধিক গবেষণায় জানা গিয়েছে, প্রায় ৮৫ শতাংশ মানুষের পেটেই কৃমি থাকে। তবে সেটি খুব বেড়ে গেলে কিন্তু অত্যন্ত সমস্যা হয়। সবথেকে বড় কথা কৃমি যদি একবার ঠিক হয়েও যায় সেটা যে আবার পুনরায় ফিরে আসবে না এমনটা কিন্তু নয়। যদি আপনারা সঠিক সময় চিকিৎসা না করেন সেক্ষেত্রে কিন্তু আপনাদের একটি শারীরিক জটিলতা তৈরি হয়ে যাবে।

প্রথমে কৃমি আমাদের অন্ত্রে বাসা বাঁধে তারপর সারা শরীরে ছড়িয়ে যায়। ছোট থেকে বড় প্রায় সব ধরনের কৃমি হতে পারে। বড় কৃমি প্রায় ১৪ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। আপনার শিশুর কৃমি হয়েছে কিনা সেটা বোঝার জন্য বিশেষ কিছু লক্ষণ রয়েছে। এর মধ্যে প্রধান কয়েকটি লক্ষণ নিয়ে নিম্নে আলোচনা করা হলো।

১) দীর্ঘ সময় ধরে শিশুদের ল্যাট্রিন করার জায়গায় যদি চুলকানি হয়ে থাকে তাহলে বুঝবেন তার শরীরে কৃমি হয়েছে। এমনকি এই চুলকানি এতটাই বেড়ে যায় যে ঘুমানোর সময়ও শিশুরা এদিক-ওদিক করতে থাকে। শিশুরা ঘুমোতে পারেনা এবং এক প্রকার খিটখিটে মেজাজের হয়ে যায়। যদি অত্যধিক পরিমাণে কুচো কৃমি হয়ে থাকে তাহলে মলদ্বারের আশেপাশে আপনারা টর্চ মেরে কৃমি গুলিকে দেখে নিতেও পারবেন।

২) পেটে মোচর দিয়ে ব্যথা করার পাশাপাশি সব সময় বমি বমি ভাব বা গা গোলানো কৃমি হওয়ার আরো একটি অন্যতম লক্ষণ।। তবে পুষ্টির অভাবের কারণেও অনেক সময় এই লক্ষণ দেখা দেয় তাই একবার অবশ্যই আপনাদের ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করে নেওয়া প্রয়োজন।

৩) শিশুর শরীরের পুষ্টিগুণ গুলোর উপরে কৃমি আক্রমণ করে থাকে। তাই শরীরে কৃমি যদি বাসা বাঁধে শিশুদের কিন্তু নানান ধরনের শারীরিক সমস্যা দেখা দেয়। পুষ্টির ঘাটতি দেখা দেওয়ার কারণে শিশুর ওজন বৃদ্ধি হয় না এবং আরো সমস্যা হয়।

 

৪) দুর্গন্ধযুক্ত পটি বা ডায়েরিয়ার লক্ষণ শিশুর কৃমি হওয়ার অন্যতম লক্ষণ গুলির মধ্যে একটি। শুধুমাত্র তাই নয় পায়খানা দ্বার দিয়ে কিন্তু রক্ত বেরোতেও পারে।

৫) কৃমি হলে শিশুদের ওজন বৃদ্ধি ব্যাহত হয়ে যায়। যেহেতু শিশুর শরীর থেকে সম্পূর্ণ পুষ্টিগুণ ওই পরজীবী প্রাণীরা সংগ্রহ করে নিচ্ছে তাই শিশুদের ওজন বৃদ্ধি ব্যাহত হয়ে যায় এবং পাশাপাশি প্রচন্ড পরিমাণে শারীরিক দুর্বলতা দেখা দেয়।।

৬) শিশুদের দৈনন্দিন অ্যাক্টিভিটি কিন্তু অত্যন্ত ধীর গতিতে হয়ে পড়ে। অর্থাৎ তারা অমনোযোগী হয়ে পড়ে এবং অল্প কাজ করলেই হাঁপিয়ে যায় বা খিটখিটে ভাব করতে থাকে।

কৃমির সমস্যা থেকে মুক্তির উপায়:

কৃমির চিকিৎসা শুরু করার জন্য আপনাদের প্রথমেই কিন্তু কোন ভালো ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করে নিতে হবে। ডাক্তার যদি জানায় শিশুর কৃমি হয়েছে তাহলে অবশ্যই তাকে কৃমির প্রয়োজন অনুযায়ী ওষুধ খাওয়াতে হবে। শিশুর সাথে সাথে শিশুর সংস্পর্শে যারা রয়েছে তাদের সকলের মধ্যেই কৃমির সংক্রমণ হতে পারে। সুতরাং তাদেরও কিন্তু ডাক্তার দেখিয়ে পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ খেয়ে নিতে পারেন।

বড়দের ক্ষেত্রে সাধারণত ডাক্তার বাবুরা ওষুধ হিসেবে ট্যাবলেট দিয়ে থাকেন। তবে শিশুদের ক্ষেত্রে সাধারনত চিকিৎসকেরা একপ্রকার সিরাপ ব্যবহার করেন। যদি পেটে বড় কৃমি হয়ে যায় তাহলে কিন্তু দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা করতেই হবে। তবে এটাও জানিয়ে রাখি যে ওষুধ কিন্তু একবার খেলেই আপনাদের কৃমি সেরে যাবে না। কৃমি তাড়ানোর জন্য কিছু ঘরোয়া টোটকা রয়েছে। চলুন সেগুলি জেনে নেওয়া যাক।

১) কৃমির সংক্রমণ কমাতে যে দুটি ঘরোয়া জিনিস সবথেকে বেশি কাজে দেয় তা হলো নিম এবং করলা। এই দুটি সবজি শরীর থেকে খুব সহজেই কৃমি দূর করতে পারে। যদি আপনারা এগুলিকে কাঁচা চিবিয়ে না খেতে পারেন সে ক্ষেত্রে করলার রস বা নিমপাতার রস করে খেতে পারেন।

২) কৃমি হলে শিশুর খাবারে আপনারা বেশি করে রসুন মেশাতে পারেন। দুধের সাথে বা খাবারের সাথে রসুনের ব্যবহার যদি আপনারা করেন তাহলে কিন্তু খুব দ্রুত আপনারাই সমস্যা থেকে মুক্তি পেয়ে যাবেন।

৩) এবারে আমরা বলব নারকেলের কথা। নারকেল কুড়িয়ে বা নারকেলের পেস্ট তৈরি করে আপনারা এই সময় খেতে পারেন এবং শিশুকে খাওয়াতে পারেন।

৪) কৃমি তাড়ানোর জন্য আপনার শিশুকে কাঁচা পেঁপে চিবিয়ে খেতে দিতে পারেন, পাশাপাশি পেঁপের রস করেও তাকে পরিবেশন করতে পারেন। খালি পেটে প্রতিদিন সকালে পেঁপের রস খেলে কিন্তু সমস্ত সমস্যা আপনাদের দূর হয়ে যাবে।

৫)কাঁচাহলুদ অ্যান্টিবায়োটিকের কাজ করে। কৃমির সমস্যা নিয়ন্ত্রণে কাঁচাহলুদ খেতে পারেন।

৬)আদা হজমের সব রকমের সমস্যা নিয়ন্ত্রণে আনতে খুবই কার্যকরী একটি উপাদান। হজমের সমস্যা, অ্যাসিডিটি, পেটে ইনফেকশন ইত্যাদি দূর করতে আদা খেতে পারেন। শিশুকে যদি আপনারা খালি পেটে আদার রস খাওয়াতে পারেন তাহলে কিন্তু দ্রুত আপনার এই কৃমির সমস্যা থেকে মুক্তি পেয়ে যাবেন।

Back to top button