ইলিশের নামে আসলে কি বিষ খাচ্ছেন? কীভাবে বুঝবেন

নিজস্ব প্রতিবেদন : মাছ খেতে পছন্দ করেন না এরকম বাঙালি কিন্তু খুব কম পাওয়া যাবে। এমনকি কথাতেই রয়েছে মাছে ভাতে বাঙালি। সোম থেকে রবি যে কোন দিনই কিন্তু মাছ ছাড়া বাঙালির খাবার সম্পূর্ণ হয় না। শুধুমাত্র বাংলা নয় ভারতের উপকূল অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষেরাও কিন্তু মনে করেন মাছ ছাড়া খাবার কখনোই সম্পূর্ণ হতে পারে না।

বর্ষার আগমনের সাথে সাথেই তাই উপকূলবর্তী অঞ্চল গুলিতে মৎস্য চাষের তীব্রতা ব্যাপকভাবে লক্ষ্য করা যায়। এরমধ্যে বহু জায়গাতে কিন্তু ইলিশের উপাচার চলে অনেক সময় ধরে। তবে আপনাদের এই প্রিয় মৎস্যই যদি হয় বিষে পরিপূর্ণ তাহলে কেমন হবে! চলুন এই বিষয়ে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন জেনে নেওয়া যাক।

যেকোনো খাদ্যদ্রব্যের সাথে ভেজাল মেশানোর ঘটনা কিন্তু এই নতুন নয়। চাল ডাল থেকে শুরু করে বহু জিনিসের সাথেই ভেজাল মেশানো ঘটনা আমরা কম বেশি শুনেছি। দিনের পর দিন বরফে মাছ সংরক্ষণ করে রেখে সেগুলি বিক্রি করার ঘটনা কিন্তু আমরা এর আগেও শুনেছি। তবে তার থেকেও বেশি বড় বিপদ লুকিয়ে রয়েছে ফরমালিনযুক্ত মাঝে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য সম্প্রতি কেরলের করলাম জেলার চেকপোষ্টে প্রায় 10000 ফরমালিনযুক্ত মাছ বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। অপারেশন সাগর রানী শুরু হওয়ার পরে ফরমালিন দেওয়া সাত হাজার কেজি চিংড়ি মাছ,2600 কেজি অন্যান্য প্রজাতির মাছ সহ মোট 21 হাজার 600 কেজি মাছ বাজেয়াপ্ত করেছে প্রশাসন।

শুধুমাত্র কেরল নয়, নাগাল্যান্ডের কোহিমাতেও প্রায় ১০ লক্ষ টাকা মূল্যের চারটি ফরমালিনযুক্ত মাছের গাড়ি আটক করেছে প্রশাসন। এই ঘটনা কিন্তু মৎস্য প্রেমীদের জন্য অত্যন্ত চিন্তার বিষয়। তবে তার জন্য আপনাদের জেনে নিতে হবে এই ফরমালিন আসলে কি? এটি একপ্রকার বিষাক্ত রাসায়নিক যা সাধারণত মৃতদেহ সংরক্ষণ করতে এবং মৃতদেহের ক্ষয় রোধ করতে ব্যবহার করা হয়। এই বর্ণহীন দাহ্য রাসায়নিক কাঠের পণ্য এবং আসবাবপত্র তৈরিতেও কাজে লাগে। ছত্রাক নাশক এবং জীবাণু নাশক হিসেবেও এটিকে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। ফরমালিনের কিন্তু আমাদের শরীরের উপর প্রচুর পরিমাণে ক্ষতিকারক প্রভাব রয়েছে।

ফরমালিন অল্প পরিমাণে ব্যবহার করলেই কিন্তু শরীরের নানান ধরনের সমস্যা দেখা দেয়। যেমন চোখের জল ভাব বেড়ে যাওয়া,কাশি শ্বাসকষ্টের পাশাপাশি ত্বকে জ্বালা ভাব সমস্ত সমস্যাই দেখা যায়। এই রাসায়নিক যদি দীর্ঘসময়ের জন্য শরীরে প্রবেশ করে থাকে সেক্ষেত্রে ক্যান্সারের ঝুঁকি কিন্তু কয়েক গুণ বেড়ে যেতে পারে। আন্তর্জাতিক ক্যান্সার গবেষণা সংস্থা এবং আমেরিকান ফুড এন্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন উভয়েই কিন্তু ফরমালিনকে অত্যন্ত ক্ষতিকারক একটি রাসায়নিক হিসেবে চিহ্নিত করেছে। মানবদেহের সংস্পর্শে এলে গলা ব্যথা থেকে শুরু করে নিউমোনিয়ার মতন সমস্যা দেখা দেয়। এমনকি যদি কোন কারনে এটি অতিরিক্ত শরীরে প্রবেশ করে সে ক্ষেত্রে ব্যক্তি কোমায় চলে যেতে পারে। এছাড়াও এর দীর্ঘমেয়াদি অনেক প্রভাব রয়েছে। এই সমস্ত সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে আপনাদের অবশ্যই মাছ কেনার আগে তাতে ফরমালিন আছে কিনা যাচাই করে নিতে হবে।

মাছে ফরমালিন আছে কিনা তা কিভাবে বুঝবেন ?

বাজার থেকে মাছ কেনার আগে তাকে ফরমালিন ব্যবহার করা হয়েছে কিনা সেটা কিন্তু আপনারা খুব সহজেই বুঝে নিতে পারবেন। সাধারণত যেসব মাছের ফরমালিন ব্যবহার করা হয়ে থাকে সেগুলি কিন্তু অন্যান্য মাছের থেকে অনেকটাই বেশি শক্ত হয়ে যায়।

মাছের মধ্যে নিজস্ব কোন গন্ধ থাকে না, এক ধরনের কড়া গন্ধ পাওয়া যায় যা আদপে ফরমালিনের গন্ধ। সব থেকে বড় ব্যাপার লক্ষ্য করে দেখবেন ফরমালিনযুক্ত মাছে কিন্তু কোন রকমের মাছি বসে না। এই সামান্য কয়েকটি বিষয় নজরে রেখেই কিন্তু আপনারা জেনে নিতে পারেন আপনারা যে মাছ কিনছেন তাতে ফরমালিন মেশানো রয়েছে কিনা।

ফরমালিনযুক্ত মাছ পরিষ্কার করার উপায়:

মাছ কেনার সময় আপনারা যদি ফরমালিনের উপস্থিতি না বুঝতে পারেন সেক্ষেত্রে কিন্তু কিছু করার নেই। বাজার থেকে যেকোনো মাছ কিনে আনার পরেই কিন্তু আপনাদেরকে ভালো করে ধুয়ে নিতে হবে। অন্ততপক্ষে 10 থেকে 12 মিনিট ধরে মাছের টুকরো গুলি কি আপনাদের ভালো করে ঘষে ধুয়ে নিতে হবে। চাইলে আপনারা চার থেকে পাঁচ ঘন্টা সময় মাছগুলিকে জলের মধ্যে ভিজিয়ে রাখতে পারেন।। যদিও দীর্ঘসময় ফরমালিনের ভিজিয়ে রাখার পরে এই সামান্য সময় একেবারেই যথেষ্ট নয় মাছ সম্পূর্ণরূপে পরিষ্কার করার জন্য। তবুও যতটা সম্ভব সুরক্ষা পাওয়া যায় আপনারা চেষ্টা করবেন তা নিয়ে।

আমাদের শরীরে ফরমালিনের কুপ্রভাব:

আমাদের শরীরে ফরমালিন মিশে গেলে কিন্তু নানান ধরনের কুপ্রভাব দেখা যায়। বেশি ফরমালিনযুক্ত খাবার বা মাছ খেলে কিন্তু আমাদের শরীরে বমি বমি ভাব দেখা দেয় এবং ডায়রিয়া শুরু হয়। চোখে জল পড়ার পাশাপাশি ফরমালিনের কারণে কিন্তু ত্বকে চুলকানি হতে পারে। ফরমালিন এর কারনে আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায় এবং ক্যান্সার আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কয়েক গুণ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে।

মৎস্য চাষীদের সংরক্ষণের জন্য এটি একটি অত্যন্ত চাহিদা সম্পন্ন রাসায়নিক হয়ে উঠলেও সাধারণ মানুষের যে এটি কত বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে সেই সম্পর্কে কিন্তু কোন ধারনাই নেই।। সুতরাং সবশেষে বলবো বাজার থেকে মাছ কিনে নিয়ে আসার পর অবশ্যই তা ভালো করে ধুয়ে নেবেন এবং বেশ কিছুটা সময় পর্যন্ত জলে ভিজিয়ে রাখবেন যাতে ফরমালিনের প্রভাব কিছুটা হলেও মুক্ত করা যায়।

Back to top button