চোখের সামনে মৃত্যু ঘটে মেয়ের, একবুক হতাশায় কাটছে জীবন, কিংবদন্তি অভিনেত্রী মৌসুমী চ্যাটার্জীর এই অজানা কাহিনী চোখে আনবে জল!

নিজস্ব প্রতিবেদন:- বাংলা থেকে যারা বলিউড ইন্ডাস্ট্রিতে গিয়ে খ্যাতি অর্জন করেছেন তাদের মধ্যে আমরা সর্বপ্রথম তালিকা তে মৌসুমী চট্টোপাধ্যায়ের নাম রাখতে পারি। আজীবন হুল্লোড়ে মৌসুমী ১৯৭০-এর দশকে বলিউডের অন্যতম ‘হাইয়েস্ট পেইড’ অভিনেত্রী ছিলেন। আজকের এই বিশেষ প্রতিবেদনে আমরা তার জীবনের কিছু অজানা কাহিনী জেনে নেব। শুরুতেই জানিয়ে রাখি, ১৯৫৫ সালের ২৬ শে এপ্রিল কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন মৌসুমী চ্যাটার্জী। তার বাবা প্রাণকৃষ্ণ চ্যাটার্জি ছিলেন একজন সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা। মৌসুমী চ্যাটার্জী বিয়ে করেছিলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের পুত্র জয়ন্ত মুখোপাধ্যায় কে।

সিনেমা জগতের খ্যাতি, স্বামী আর সন্তান নিয়ে মৌসুমীর জীবন ভালোই চলছিল একটা সময়। কিন্তু সবকিছুর মাঝেই আচমকা তার জীবনে একটি বিষাদের সুর বেজে ওঠে। গত বছর তার বড় মেয়ে মারা যায়। একদিন পরিচালক তরুণ মজুমদার তার টালিগঞ্জের বাড়ির একতলায় পাইচারি করছিলেন। হঠাৎ তার নজরে আসে পাশে স্কুলের বারান্দায় একটি ১১- ১২ বছরের মেয়েকে ঘিরে রয়েছে তার বান্ধবীরা। এই মেয়েটি অনর্গল কথা বলেই চলেছে। কাউকে একটি কথা পর্যন্ত বলার সুযোগ দিচ্ছে না। তরুণ মজুমদার তখন মনে মনে খুঁজছিলেন তার ছবি বালিকা বধূর জন্য একটি নতুন মুখ। মৌসুমির এক ঝলকেই তিনি সিদ্ধান্ত নেন যে বালিকা বধুর চরিত্র তিনি তাকে দিয়েই করাবেন।

এক বেয়ারা কে দিয়ে ডাকিয়ে তিনি মেয়েটিকে জিজ্ঞাসা করেন যে সে সিনেমাতে অভিনয় করবে কিনা! চঞ্চলমতী মৌসুমী হ্যাঁ বানাতে উত্তর দিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করে জিজ্ঞাসা করে কার বিপরীতে? তখন তরুণ বাবু বলেন তুমি কার বিপরীতে অভিনয় করতে চাও? মেয়েটি স্পষ্ট ভাষায় জানায় উত্তম কুমারের বিপরীতে হলে অভিনয় করব ,না হলে নয়। এরপর যখন তরুণ মজুমদার এই বিষয়ে মৌসুমীর বাবার সঙ্গে কথা বলেন তিনি এক কথায় মানা করে দেন। এরপর সন্ধ্যা রায়ের অনেক অনুরোধে তিনি রাজি হন। ১৯৬৭ সালে তরুণ মজুমদারের বিখ্যাত সিনেমা বালিকা বধুতে অভিনয়ের মাধ্যমে ইন্ডাস্ট্রিতে পা রাখেন মৌসুমী।

সেই সময় তার বয়স ছিল মাত্র ১২। বালিকা বধূর সেটেই হেমন্ত মুখোপাধ্যায় মৌসুমিকে দেখেন এবং পরবর্তীতে নিজের ছেলের বউ করে নিয়ে আসেন মাত্র ১৬ বছর বয়সে। খুব তাড়াতাড়ি বিয়ে হয়ে যাওয়ায় মাধ্যমিকের পর আর পড়াশোনা করতে পারেননি মৌসুমী। এরপর মুম্বাই চলে যান তিনি। তবে তার শ্বশুরবাড়ির তরফে অভিনয় কোন আপত্তি ছিল না। এরপর ১৯৭২ সালে হিন্দি সিনেমা অনুরাগের মাধ্যমে তার বলিউডে অভিষেক ঘটে। এই ছবির পরিচালক ছিলেন বাঙালি পরিচালক শক্তি সামন্ত। এই ছবিটি কিন্তু একেবারে সুপারহিট হয়েছিল।

এই ছবিতে অভিনয়ের জন্য ফিল্মফেয়ার পুরস্কার জিতেছিলেন মৌসুমী। অনুরাগের পরে তিনি শশী কাপুরের সঙ্গে ন্যায়না, উসপার প্রভৃতি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। ১৯৮১ সাল পর্যন্ত টানা অভিনয় করেছেন মৌসুমী। তিনি তখনকার সংগ্রামরত নায়ক অমিতাভ বচ্চনের সাথে একটি থ্রিলার সিনেমা “বেনাম” (১৯৭৪) এবং তারপর রাজেশ খান্নার বিপরীতে রহস্য সিনেমা “হামসাকাল” এ অভিনয় করেন। কিন্তু উভয় সিনেমাই ১৯৭৪ সালে সফলতা লাভ করতে পারে নি। তার অভিনীত সবচেয়ে সফলজনক সিনেমা হয় ১৯৭৪ সালের শেষের দিকে।

মনোজ কুমারের “রোটি কাপড়া অর মাকান” (১৯৭৪), যে সিনেমায় তিনি একজন ধর্ষিত সংগ্রামী নারীর চরিত্রে অভিনয় করেন। তার ধর্ষনের চিত্রটি এখনো হিন্দি চলচ্চিত্রে অন্যতম বিব্রতকর দৃশ্য হিসেবে বিবেচিত হয়। ১৯৭৪ সালে, তার একমাত্র হিট চলচ্চিত্র ছিল বিনোদ মেহ্‌রার সাথে মিউজিকাল রোমান্টিক গল্পভিত্তিক সিনেমা “আস পার”। এরপর একেরপর করে দশটি রোমান্টিক সিনেমায় বিনোদ মেহ্‌রার সাথে কাজ করেন এবং তারা একসাথে মোট ১৪টি সিনেমায় একসাথে অভিনয় করেন। উত্তম কুমারের সাথে তার অভিনীত সিনেমা “ওগো বধূ সুন্দরী” মুক্তি পায় ১৯৮১ সালে।

১৯৮২ সালে তিনি একটি মারাঠি সিনেমায় “তুমিহ্‌ আদকিত্তা এম হো সুপারী” নামের একটি গানের কেমিও হিসেবে উপস্থিত থাকেন। ছবিটির নাম “ভান্নাত ভানু”। বিনোদ মেহ্‌রা ব্যতীত অন্যান্য নায়ক যেমন শশী কাপুর, রাজেশ খান্না, জীতেন্দ্র এবং সঞ্জীব কুমারের সাথেও তিনি অনেক সিনেমায় অভিনয় করেন। রাজেশ খান্নার সাথে তার অভিনীত সিনেমাগুলো হল- ভোলা ভালা, প্রেম বান্ধান, ঘর পরিভার। তিনি নাইনা, আনারী, গৌতাম গৌভান্দা, সোয়াম্ভার, ঘর এক মান্দির সিনেমায়ও অভিনয় করেন। বহু পার্শ্ব চরিত্রেও অভিনয় করেছেন মৌসুমী চ্যাটার্জী। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য এর পরই ২০১৯ সালে তার জীবনে নেমে আসে একটি ভয়ংকর বিপর্যয়।

ছোটবেলা থেকেই টাইপ টু ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ছিলেন মৌসুমির বড় মেয়ে। বহু যত্নে লালন-পালন করে মেয়েকে শ্বশুরবাড়িতে পাঠিয়েছিলেন মৌসুমী। কিন্তু অসুস্থতার কারণে অবহেলা ছাড়া কিন্তু বিশেষ কিছু জোটেনি তার বড় মেয়ের। শেষমেষ বাপের বাড়িতেই ফেরত এসেছিল সে। এরপর অনেক চেষ্টার পরেও তাকে আর বাঁচানো যায়নি।

২০১৯ সালে ইহলোক ত্যাগ করেন মৌসুমী চ্যাটার্জির বড় মেয়ে পায়েল। এরপর মেয়ের মৃত্যুতে সম্পূর্ণরূপে ভেঙ্গে পড়েন মৌসুমী। বর্তমানে স্বামী আর ছোট মেয়েকে নিয়ে এক বুক হতাশা নিয়ে বেঁচে রয়েছেন তিনি।

Back to top button